নিজস্ব সংবাদদাতা,কাঁকসা(খবর7দিন প্লাস):-পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসা ব্লকের বনকাটি পঞ্চায়েতের অযোধ্যা গ্রামের বহু প্রাচীন পিতলের রথ শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য, শিল্পকলা ও ইতিহাসের এক অমূল্য নিদর্শন। অন্যদিকে, কাঁকসার রথতলার রথের মেলা আজও গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ হলেও, সেই মেলার প্রাণ ছিল যে মাটির পুতুল, বিশেষ করে বিখ্যাত ‘ঘাড় নড়া দাদু’, তা আজ হারিয়ে যাওয়ার মুখে। একদিকে ইতিহাসের গৌরব, অন্যদিকে বিলুপ্তপ্রায় লোকশিল্প এই দুইয়ের মেলবন্ধনই কাঁকসার রথযাত্রাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।
জানা যায়, অযোধ্যা গ্রামের মুখার্জি পরিবারের উদ্যোগেই কয়েকশো বছর আগে এই রথযাত্রার সূচনা হয়। লাক্ষা ও গালার ব্যবসায় একদিনের মুনাফার অর্থ দিয়ে তৈরি করা হয় বিশালাকৃতির পিতলের এই রথ। বৈবাহিক সূত্রে রায় পরিবারেরও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এখনও জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা এই রথে চড়েই মাসির বাড়ি যান।
নবরত্ন মন্দিরের আদলে নির্মিত পিতলের রথটির গায়ে ফুটে উঠেছে ভারতীয় পুরাণ ও ইতিহাসের অসাধারণ শিল্পকর্ম। সমুদ্র মন্থন, রাম-রাবণের যুদ্ধ, চার যুগের নানা কাহিনি, বাংলা সহজ পাঠের দৃশ্য, এমনকি জিমন্যাস্টিকের ছবিও খোদাই করা রয়েছে রথের গায়ে। যদিও এই অনন্য শিল্পকর্মের নির্মাতার পরিচয় আজও অজানা।
রথযাত্রা ও উল্টো রথের দিনে হাজার হাজার মানুষের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে অযোধ্যা গ্রাম। স্থানীয়দের মতে, রথযাত্রার তুলনায় উল্টো রথের দিন উৎসবের আবহ আরও বেশি জমে ওঠে। উৎসব শেষে ঐতিহাসিক রথটি মুখার্জি পরিবারের প্রাচীন বাড়ির চত্বরে সংরক্ষিত থাকে। একসময়ের রাজপ্রাসাদসম সেই বাড়ি আজ সময়ের সাক্ষী হয়ে অনেকটাই ধ্বংসপ্রায়।
অন্যদিকে, প্রায় একশো বছরের পুরনো কাঁকসার রথতলার রথের মেলাও এলাকার অন্যতম ঐতিহ্য। একসময় এই মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল মৃৎশিল্পীদের হাতে তৈরি মাটির পুতুল, বিশেষ করে ‘ঘাড় নড়া দাদু’। পাকা দাড়ি, হাতে হুঁকো আর ঘাড় নাড়ানোর অভিনব বৈশিষ্ট্যের জন্য শিশুদের কাছে এটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য আজ অস্তিত্বের সংকটে। মাটির দাম বৃদ্ধি, উপযুক্ত মাটির অভাব এবং প্লাস্টিকের খেলনার দাপটে মাটির পুতুলের চাহিদা অনেকটাই কমেছে। কাঁকসার রথতলায় বর্তমানে মাত্র কয়েকজন মৃৎশিল্পী এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। অনেকেই জীবিকার তাগিদে কাঠের খেলনা তৈরিতে ঝুঁকেছেন।
মৃৎশিল্পী প্রশান্ত সূত্রধর জানান, একসময় রথের মেলায় শত শত ‘ঘাড় নড়া দাদু’ বিক্রি হতো। এখন সেই সংখ্যা হাতে গোনা। নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়া, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার কারণে এই লোকশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।
ঐতিহাসিক পিতলের রথ যেমন বাংলার অতীতের গৌরব বহন করছে, তেমনই রথতলার মাটির পুতুল গ্রামীণ শিল্প-সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কাঁকসার এই দুই ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষণ নয়, আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও প্রয়োজন প্রশাসন, সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ। কারণ, ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে শুধু একটি শিল্প নয়, হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পরিচয়।





