সরকার বদলালেও থামেনি ‘ঝাড়খণ্ড লটারি’র অবৈধ কারবার, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

 

সত্যনারায়ন সিং,আসানসোল(খবর7দিন প্লাস):- রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল ও নতুন সরকার গঠনের পরও আসানসোল শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় ‘ঝাড়খণ্ড লটারি’ নামে পরিচিত অবৈধ লটারির রমরমা ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুলিশের নাকের ডগায় কীভাবে এই অবৈধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

নির্বাচন-পূর্বে বড়সড় উদ্ধার, তবুও ফের সক্রিয় চক্র

উল্লেখ্য, গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে নাকা তল্লাশির সময় পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা বিপুল পরিমাণ অবৈধ লটারির টিকিট ও নগদ অর্থ উদ্ধার করেছিল। সেই সময় কয়েক লক্ষ টাকার অবৈধ লটারি সামগ্রী বাজেয়াপ্ত হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের সময় কিছুটা লাগাম পড়লেও বর্তমানে ফের পুরোদমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই চক্র বলে অভিযোগ।

কোথায় কোথায় বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক?

স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই অবৈধ ব্যবসার মূল কেন্দ্র কুলটি। সেখান থেকে গোটা সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ। কুলটি থানার কুলটি, নিয়ামতপুর ফাঁড়ি, চৌরঙ্গি ফাঁড়ি ও কল্যাণেশ্বরী এলাকা ছাড়াও সালানপুর থানার দেন্দুয়া, সালানপুর, রূপনারায়ণপুর-সহ একাধিক এলাকায় এই অবৈধ লটারির জাল বিস্তৃত রয়েছে।

কীভাবে চলে এই অবৈধ লটারির খেলা?

অভিযোগ, সরকারি বৈধ লটারির ফলাফলকে ভিত্তি করে দিনে তিনবার এই অবৈধ লটারির খেলা পরিচালিত হয়। প্রতিটি টিকিটের দাম ১০ থেকে ১২ টাকা। বেশি কমিশনের আশায় বিক্রেতারা এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় সাধারণ মানুষ এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। পুরো ব্যবসাই অবৈধ হওয়ায় সরকারের কোনও রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী, যার নম্বর মিলে যায়, তাকে নির্দিষ্ট বিক্রেতার কাছ থেকেই পুরস্কারের অর্থ সংগ্রহ করতে হয়।

সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কারা?

স্থানীয় সূত্র ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এই অবৈধ লটারির টিকিট সরবরাহের পিছনে একটি সুসংগঠিত চক্র কাজ করছে। অভিযোগের তিরে উঠে এসেছে কুলটির কয়েকজন ব্যক্তির নাম। এছাড়াও সালানপুর, জেমাহারি, দেন্দুয়া, চৌরঙ্গি, রূপনারায়ণপুর ও নিয়ামতপুর এলাকার একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সরকারি কোনও নিশ্চিতকরণ মেলেনি।

নতুন কৌশলে চলছে ব্যবসা

পুলিশের নজর এড়াতে এবং ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এখন নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ। ক্রেতারা নিজের পছন্দের নম্বর বেছে নিতে পারছেন এবং বিক্রেতারা হাতে লেখা স্লিপ দিয়ে লেনদেন সম্পন্ন করছেন, যাতে ডিজিটাল প্রমাণ না থাকে।

রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর।

বিজেপি নেতা অভিজিৎ রায় বলেন, “রাজ্য সরকার সমস্ত অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। প্রশাসন প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।”

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক শুভাশিস মুখার্জি বলেন, “বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব শাসকদলের হাতে। নির্বাচনের আগে বড়সড় উদ্ধার হওয়ার পরও যদি আবার এই অবৈধ লটারি ব্যবসা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে কারা এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে, তা মানুষ বুঝতে পারছে।”

পুলিশের বক্তব্য

পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে, অবৈধ লটারিসহ বিভিন্ন বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অতীতে এবং বিশেষ করে নির্বাচনের সময় বিপুল পরিমাণ লটারির টিকিট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং সন্দেহভাজন বিভিন্ন স্থানের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

পুলিশের দাবি, খুব শীঘ্রই এই চক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এই অভিযোগ সামনে আসার পর গোটা শিল্পাঞ্চল জুড়ে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

নবীনতর পূর্বতন