মোহাম্মদ শাহজাহান আনসারী,ইন্দাস(বাঁকুড়া)-খবর7দিন প্লাস:- গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ককরোচ জনতা পার্টির কর্মী শেখ আব্দুল হাফিজের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার জেরে হামলার অভিযোগ ওঠে তাঁর বাড়িতে। হামলায় গুরুতর জখম হন তাঁর বাবা শেখ মহম্মদ মাফিক। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘিরে এবার তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়েছে বাঁকুড়ার ইন্দাসে। ঘটনায় মৃতের স্ত্রী হাসিনা বেগমের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিজেপির স্থানীয় বুথ সভাপতি অষ্টম মাঝি-সহ মোট আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের খুনের মামলা রুজু করে বিষ্ণুপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে,ইন্দাস থানার করিশুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা শেখ আব্দুল হাফিজ গত ১৯ জুলাই দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির একটি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ২৭ জুলাই তিনি গ্রামে ফেরেন। এরপর সংগঠনের নির্দেশে গত ১৩ অগস্ট করিশুন্ডা পশ্চিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে স্কুলের পঠন-পাঠনের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে যান তিনি।
অভিযোগ, স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাশিনাথ দে তাঁকে একদিন পর স্কুলে আসতে বলেন। এরপরই স্থানীয় কয়েকজন বিজেপি কর্মীকে তাঁর পিছনে লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে পুলিশের তদন্ত চলছে।
অভিযোগ, ওই রাতেই একদল দুষ্কৃতী লাঠি, রড ও শাবল নিয়ে শেখ আব্দুল হাফিজের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীদের হাত থেকে কোনওক্রমে ঘরে ঢুকে প্রাণে বাঁচেন হাফিজ। কিন্তু তাঁর বাবা শেখ মহম্মদ মাফিককে বাড়ির বাইরে ধরে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।
পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে গুরুতর আহত অবস্থায় শেখ মহম্মদ মাফিককে উদ্ধার করে ইন্দাস ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ১৫ অগস্ট তাঁকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমে আটজনকে আটক করে। এরপর মৃতের স্ত্রী হাসিনা বেগম ১৮ অগস্ট ইন্দাস থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি মোট ১০-১৫ জন হামলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে আটক আটজনকেই গ্রেফতার করে পুলিশ।
ধৃতদের মধ্যে অষ্টম মাঝি স্থানীয় বিজেপি নেতা ও বুথ সভাপতি হিসেবে পরিচিত বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনায় আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। তবে হামলার সঙ্গে কারা যুক্ত এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
মৃতের পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা সকলেই বিজেপির সঙ্গে যুক্ত। মৃতের স্ত্রী হাসিনা বেগম অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি, এমনকি ফাঁসির দাবিও জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ঘটনায় রাজনৈতিক যোগের অভিযোগ অস্বীকার বা সমর্থনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্যের পাশাপাশি পুলিশের তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের পাশে তৃণমূল, মমতার ফোনে আশ্বাস
ঘটনার পর মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে তৎপর হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় নির্দেশে তৃণমূলের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইন্দাসে গিয়ে মৃতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানায়। প্রতিনিধি দলে দলের সাংসদ ও বিধায়করা ছিলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
প্রতিনিধি দলটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সময়ই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন বলে দলীয় সূত্রে দাবি। তিনি ঘটনার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারকে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। প্রয়োজনীয় আইনি ও সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দল ও প্রশাসন সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তৃণমূলের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে।
মৃতের পরিবারের পাশে SFI, স্কুলের পরিকাঠামো নিয়েও সরব
এরই মধ্যে মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে এসএফআই। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে-র নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল করিশুন্ডা গ্রামে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করে। শেখ আব্দুল হাফিজের বাবার মৃত্যুর বিচার এবং রাজ্যের স্কুলগুলির পরিকাঠামো ও পঠন-পাঠনের পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে সরব হয় তারা।
এসএফআই নেতৃত্বের বক্তব্য, স্কুলের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একটি পরিবারকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মৃতের ছেলে শেখ আব্দুল হাফিজও তাঁর বাবার মৃত্যুর প্রকৃত বিচার দাবি করার পাশাপাশি রাজ্যের স্কুলগুলির হাল ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন একদিকে যেমন খুনের অভিযোগের তদন্ত ও গ্রেফতার হওয়া আটজনকে ঘিরে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে স্কুলের পরিবেশ, রাজনৈতিক সংঘাত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পুরো ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত কারণ কী এবং হামলায় আর কারা যুক্ত ছিল, তদন্তের মাধ্যমে তার উত্তর খুঁজছে ইন্দাস থানার পুলিশ।



