নিজস্ব প্রতিবেদন,(খবর7দিন প্লাস):- তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি আলাদা, চোখের ভাষা আলাদা, চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতাও ছিল স্বতন্ত্র। পর্দায় তিনি যখন হাজির হতেন, তখন অনেক সময় সংলাপের থেকেও বেশি কথা বলত তাঁর অভিব্যক্তি। সেই শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকরের প্রয়াণের খবরে শোকস্তব্ধ চলচ্চিত্র মহল। ৭৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনুরাগীদের মধ্যেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও তাঁকে স্মরণ করে পোস্ট করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা উঠে এলেও তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ও শেষ মুহূর্তের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে সরকারি বা পরিবারের পক্ষের বিস্তারিত বিবৃতি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত তা নিশ্চিত করে বলা ঠিক হবে না।
তবে নানা পাটেকরের চলে যাওয়া যে ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য এক বড় শূন্যতা, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কারণ তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না, নিজের অভিনয়ের একটি আলাদা ভাষা তৈরি করেছিলেন।
বিশ্বনাথ থেকে ‘নানা’ পাটেকর
নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুড-জঞ্জিরা অঞ্চলে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই শিল্প ও অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। মুম্বইয়ের Sir J. J. Institute of Applied Art-এ পড়াশোনা করেন তিনি।
চলচ্চিত্রে আসার আগে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নানা। মঞ্চের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর অভিনয়ে গভীরতা এনে দেয়। চরিত্রের সংলাপ মুখস্থ করে বলার বদলে চরিত্রটির মানসিকতা বুঝে অভিনয় করা এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে ধীরে ধীরে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।
‘গমন’ দিয়ে শুরু, তারপর দীর্ঘ পথ
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করতে করতে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি।
‘অঙ্কুশ’, ‘প্রহার’, ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’, ‘গুলাম-ই-মুস্তফা’, ‘ইয়শবন্ত’, ‘অপহরণ’, ‘রাজনীতি’, ‘অব তক ছপ্পন’ বিভিন্ন সময়ে নানা পাটেকরের অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
আবার শুধুমাত্র গম্ভীর বা কঠিন চরিত্রেই নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি। ‘ওয়েলকাম’-এর মতো জনপ্রিয় কমেডি ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করে, চরিত্রের ধরন বদলালেও দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার ক্ষমতা তাঁর ছিল অনন্য।
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ‘পরিন্দা’। ১৯৮৯ সালের এই ছবিতে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়োয় এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সহ-অভিনেতা হিসেবে সম্মানিত হন তিনি।
এরপর ১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ তাঁর অভিনয়জীবনের আরেক মাইলফলক। এই ছবিতে বিক্রম নামে তাঁর চরিত্র দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। ছবিটির জন্য তিনি সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
এই দুই ছবিই প্রমাণ করে দেয় নানা পাটেকর শুধু জনপ্রিয় অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন অভিনয়ের একজন শক্তিশালী শিল্পী।
‘প্রহার’-এ অভিনেতা ও পরিচালক
নানা পাটেকরের বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি পরিচয় ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’। ১৯৯১ সালের এই ছবিতে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনার দায়িত্বও সামলান।
সামরিক জীবনের কঠোরতা, শৃঙ্খলা এবং মানবিক আবেগকে কেন্দ্র করে তৈরি ছবিটি তাঁর সৃজনশীলতার অন্য দিক সামনে আনে।
‘অব তক ছপ্পন’-এ অন্য এক নানা
২০০৪ সালের ‘অব তক ছপ্পন’ ছবিতে পুলিশ আধিকারিক সদাশিব আমরাপুরকরের চরিত্রে তাঁর অভিনয়ও ব্যাপক প্রশংসিত হয়। ঠান্ডা মাথার, কঠিন অথচ নিজের নীতিতে অটল পুলিশ অফিসারের চরিত্রে নানা পাটেকরের অভিনয় ছবিটিকে আলাদা মাত্রা দেয়।
অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি চরিত্রে তাঁর কমিক টাইমিংও দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়।
সম্মানের ঝুলিও কম নয়
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি ফিল্মফেয়ারসহ বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে ভারত সরকার।
পর্দার বাইরেও মানুষের নানা
শুধু অভিনয় নয়, সমাজসেবার ক্ষেত্রেও নানা পাটেকরের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ ও কৃষক সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন তিনি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সহজ সম্পর্ক এবং সাদামাটা জীবনযাপনের জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন।
পর্দায় কখনও কঠোর পুলিশ অফিসার, কখনও বিদ্রোহী চরিত্র, কখনও অপরাধজগতের ভয়ঙ্কর মানুষ, আবার কখনও হাসির চরিত্র বহু বৈচিত্র্যের মধ্যেও নানা পাটেকরের অভিনয়ে একটি বিষয় সবসময় একই থেকেছে, আর তা হল নিজস্বতা।
তাঁর সংলাপ বলার ধরন বহু মানুষ অনুকরণ করেছেন। কিন্তু সেই স্বর, সেই চোখের অভিব্যক্তি, সেই শরীরী ভাষা হুবহু পুনরায় তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
এক বিরাট শূন্যতা
নানা পাটেকরের প্রয়াণ শুধু একজন অভিনেতার চলে যাওয়া নয়, ভারতীয় সিনেমার একটি স্বতন্ত্র অভিনয়ধারার অধ্যায়ের অবসান। যে অভিনেতা নায়ক-খলনায়কের প্রচলিত সীমারেখা পেরিয়ে চরিত্রকে নিজের অভিনয় দিয়ে স্মরণীয় করে তুলেছিলেন, তাঁর জায়গা পূরণ করা সহজ হবে না।
‘গমন’ থেকে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ থেকে ‘অব তক ছপ্পন’, ‘প্রহার’ থেকে ‘ওয়েলকাম’ দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে দিয়েই দর্শকের মনে বেঁচে থাকবেন নানা পাটেকর।
রুপোলি পর্দার সেই স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর থেমে গেলেও তাঁর অভিনয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে বহুদিন প্রতিধ্বনিত হবে।

