নিজস্ব সংবাদদাতা,কাঁকসা(খবর7দিনে প্লাস):-সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের হাতে আক্রান্ত হলেন এক মহিলা সাংবাদিক ও তাঁর চিত্র সাংবাদিক। গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কলকাতার একটি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের মহিলা সাংবাদিক সোমা মাইতি।
ঘটনার সূত্রপাত ঝাড়খণ্ডে এক ফেরিওয়ালাকে বেধড়ক মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গুরুতর আহত ওই ফেরিওয়ালা মুর্শিদাবাদে পৌঁছালে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে রেখে বিক্ষোভ শুরু করেন এলাকার মানুষ। শুক্রবার মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় সড়ক অবরোধের পাশাপাশি রেললাইনেও বিক্ষোভ শুরু হয়। ফলে সড়ক ও রেলপথে সম্পূর্ণভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে খবর সংগ্রহ করতে ঘটনাস্থলে যান সাংবাদিক সোমা মাইতি। অভিযোগ, সেই সময় বিক্ষোভকারীরা হঠাৎ তাঁর উপর চড়াও হয়। চুলের মুঠি ধরে তাঁকে মারধর করা হয়। কোনোমতে সেখান থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে বেরিয়ে এসে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা করান।
ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিভিন্ন মহলে তীব্র নিন্দা শুরু হয়। পাশাপাশি ঘটনার প্রতিবাদে সরব হন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শনিবার দুপুর তিনটেয় কাঁকসার বাস কোপায় একটি হোটেলে সাংবাদিক বৈঠক করেন বিজেপি নেত্রী তথা রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদিকা লকেট চট্টোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুই, দুর্গাপুর পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি নেতা সন্তোষ মুখার্জী, পশ্চিম বর্ধমান জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অন্যান্য বিজেপি নেতৃত্ব।
সাংবাদিক বৈঠকে লকেট চট্টোপাধ্যায় বলেন, “একজন সাংবাদিকের কাজই হল খবর সংগ্রহ করা। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই মহিলা সাংবাদিক সোমা মাইতির উপর নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর সঙ্গে চরম অশালীন আচরণ করা হয়েছে। একটু এদিক-ওদিক হলে তাঁকে মেরেই ফেলা হত।”
তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার সময় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। পুলিশের কাছে সাহায্য চাওয়া হলেও কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। এমনকি ঘটনাস্থল ছেড়ে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য কোনও গাড়ির ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়নি। একটি টোটোতে করে বেরিয়ে আসার সময় টোটো চালককেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।লকেট চট্টোপাধ্যায় আরও জানান,
শনিবারও বেলডাঙার ঘটনায় সাংবাদিক কৌশিক ঘোষ ও পলাশ মণ্ডল মারধরের শিকার হন এবং চিত্র সাংবাদিক কেষ্ট দত্ত আক্রান্ত হন। একের পর এক সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিজেপি নেত্রী। তাঁর অভিযোগ, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে মুখ্যমন্ত্রী দূর থেকে ছবি তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে স্পষ্ট যে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
লকেট চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন, গোটা ঘটনাটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বেলডাঙার আন্দোলনের জেরে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অথচ মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরা সবাই নীরব। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে তুষ্টিকরণের রাজনীতি চলছে বলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সিএএ ঘোষণা হতেই আন্দোলনের নামে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, ট্রেনে হামলা, পাথর ছোড়া ও টিকিট কাউন্টার লুটের ঘটনা ঘটেছে। ওয়াকফ বিল ঘোষণা হওয়ার পরও মুর্শিদাবাদে ভয়াবহ তাণ্ডব, লুটপাট ও মহিলাদের উপর অত্যাচার হয়েছে। সেই সময়েও পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ।
এছাড়াও ডিএল অশোক দাসের মৃত্যুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁকে আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছে। ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অনন্যা ব্যানার্জি ও তাঁর সহযোগীরা এই ঘটনার জন্য দায়ী বলে অভিযোগ করেন তিনি। লকেট চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন, তৃণমূলের চাপে বিএলওদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ না দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
একদিকে মুখ্যমন্ত্রী বাংলা ভাগ চান না বললেও, আন্দোলনের জেরে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, একের পর এক নাম কাটার ফলে তৃণমূল বুঝে গেছে আসন্ন নির্বাচনে তাদের পরাজয় নিশ্চিত।
সবশেষে তিনি বলেন, যখন গোটা বেলডাঙা উত্তাল, তখন একদিকে মুর্শিদাবাদে সভা করছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদিকে আলাদা জায়গায় সভা করছেন তৃণমূলের সাসপেন্ড বিধায়ক হুমায়ুন কবির। লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য, “এটা একই আয়নার এপিঠ-ওপিঠ—পুরোটাই ষড়যন্ত্র।”
তিনি দাবি করেন, মহিলা সাংবাদিক ও অন্যান্য সাংবাদিকদের উপর হামলাকারীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।



